মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সুদ ব্যয় বাড়তে পারে কয়েক বিলিয়ন ডলার

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ঋণের সুদ পরিশোধে অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের। দেশটির সরকারি ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি ও ঋণের চাপ আরো বাড়বে। খবর এফটি।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে টানা তিন মাসের সংঘাতের পর দেশটির সরকারি ঋণ নেয়ার খরচ ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিনিয়োগকারীরা মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কায় সরকারি বন্ড বিক্রি করছেন। এতে দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার বেড়ে গেছে।

প্রতিবেদন বলছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশে, যুদ্ধ শুরুর আগে যা ছিল ৪ শতাংশ। চলতি বছরের জন্য কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস বা সিবিও যে ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ পূর্বাভাস দিয়েছিল, তার চেয়েও এটি বেশি। পাশাপাশি ৩০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহারও ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিশ্লেষণ বলছে, চলতি অর্থবছরের বাকি চার মাসে যদি ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশে থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত প্রায় ৮০০ কোটি ডলার সুদ ব্যয় গুনতে হবে। আর ২০২৭ অর্থবছরজুড়ে একই অবস্থা থাকলে সুদ বাবদ বাড়তি ব্যয় ৩ হাজার কোটি ডলারের বেশি হতে পারে।

এর আগে সিবিওর পূর্বাভাসে বলা হয়, ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুদ পরিশোধের ব্যয় ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে, যা দেশটির জিডিপির ৩ দশমিক ৩ শতাংশের সমান। পাশাপাশি ২০৩৬ সালের মধ্যে এ ব্যয় বেড়ে ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। তখন তা জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হবে। বাজেট ঘাটতি কমাতে রাজনৈতিক অগ্রগতি না হওয়ার আশঙ্কা থেকেই এমন পূর্বাভাস দেয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলছেন, সিবিও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সক্ষমতাকে কম করে দেখছে। তার মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতির কারণে অর্থনীতি আরো দ্রুত বাড়তে পারে। তাতে কর আদায় বাড়বে এবং ঋণের সুদের চাপ কিছুটা কমতে পারে।

তবে বড় বিনিয়োগকারীদের অনেকেই এতে আশ্বস্ত নন। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের সুদহার বাড়তে থাকলে তা একধরনের চক্র তৈরি করবে। কারণ সুদের ব্যয় বাড়লে সরকারকে আরো বেশি ঋণ নিতে হবে। আর বেশি ঋণ নিলে আবার সুদহারও বাড়তে পারে।

বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ডাবললাইনের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক বিল ক্যাম্পবেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন এক ঋণপথে আছে যেখানে দেনা ক্রমেই বাড়ছে। তার মতে, বাজেট ঘাটতি কমানোর মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা এখন দেখা যাচ্ছে না। ফলে বাজার পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি সুদহার বাড়ার প্রভাব এখন সাধারণ মানুষও অনুভব করতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গৃহঋণের সুদহার দ্রুত বাড়ছে। ২০০৭ সালের পর প্রথম সম্প্রতি ৩০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণ বিক্রিতে সুদহার ৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

এদিকে এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদক মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এতে ধারণা করা হচ্ছে, আগামী মাসগুলোয় সাধারণ ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম আরো বাড়বে।

এসব তথ্য প্রকাশের পর বিনিয়োগকারীরা আগামী এক বছরের মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা ৪ শতাংশের ওপর নিয়ে গেছেন। একই সঙ্গে তারা সরকারি বন্ড বিক্রি শুরু করেছেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ বা ফেড মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট প্রস্তুত নয় বলেও ধারণা তৈরি হয়েছে বাজারে।

জেপিমর্গ্যান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা বব মিশেল জানান, বিশ্বজুড়ে সুদহার বাড়ার পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নিষ্ক্রিয়তাও কাজ করছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার বাড়ানোর অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে বেশি চিন্তিত।

তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা এখন নিজেরাই বাজারে চাপ তৈরি করছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে বাজারই সরকারগুলোর জন্য ঋণ নেয়াকে আরো কঠিন করে তুলবে।’

এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা কী করতে পারেন, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। কেউ কেউ বলছেন, সরকার আরো বেশি স্বল্পমেয়াদি ঋণের ওপর নির্ভর করতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি সাময়িক সমাধান ছাড়া কিছু নয়।

আবার অনেকে মনে করছেন, ফেড অতীতে ব্যবহৃত ‘অপারেশন টুইস্ট’ ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে। এতে স্বল্পমেয়াদি বন্ড বিক্রি করে দীর্ঘমেয়াদি বন্ড কেনা হয়, যাতে দীর্ঘমেয়াদি সুদহার কমানো যায়।

বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তে থাকা ঋণ ও সুদের চাপ সামাল দেয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে বাজেট ঘাটতি কমানো। এজন্য কর আদায় বাড়ানো বা সরকারি ব্যয় কমানো প্রয়োজন। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা সহজ নয়।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ও সাবেক আইএমএফ-প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় ঋণগ্রস্ত দেশগুলো এখন জনতুষ্টিমূলক রাজনৈতিক চাপে আটকে আছে। ফলে কঠিন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।’

তিনি সতর্ক করে জানান, ঋণের মেয়াদ কমিয়ে স্বল্পমেয়াদে সুদের ব্যয় কমানো সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এতে আরো বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কারণ ভবিষ্যতে সুদহার আরো বেড়ে গেলে পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠবে।

আরও